===

যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েও পাশে ছিল | হৃদয়স্পর্শী শিক্ষামূলক বাংলা গল্প

গল্পের নামঃ যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েও পাশে ছিল  

শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি বাড়িতে বসবাস করতেন আবদুল করিম। বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি বছর। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন সাধারণভাবে। বড় কোনো সম্পদ ছিল না, ছিল না বিশাল বাড়ি কিংবা ব্যাংকে অনেক টাকা। কিন্তু তার ছিল একটি সুন্দর মন, সততা আর মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

করিম সাহেব ছোট একটি চাকরি করতেন। বেতন খুব বেশি ছিল না, কিন্তু সেই সামান্য আয় দিয়েই তিনি নিজের পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন।

তার স্ত্রী রহিমা বেগম এবং একমাত্র ছেলে সাদ ছিল তার পৃথিবী।

সাদ যখন ছোট ছিল, তখন করিম সাহেবের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করা।

প্রতিদিন সকালে ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর আগে তিনি বলতেন,

— "সাদ, জীবনে বড় হতে চাইলে শুধু ভালো চাকরি বা টাকা অর্জন করলেই হবে না। একজন ভালো মানুষ হতে হবে। কারণ মানুষের আসল পরিচয় তার সম্পদে নয়, তার ব্যবহারে।"

ছোট্ট সাদ বাবার কথা শুনে মাথা নাড়ত।

সে জানত না, বাবার প্রতিটি কথা একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

সময় এগিয়ে গেল।

সাদ বড় হতে লাগল। পড়াশোনায় সে খুব ভালো ছিল। করিম সাহেব নিজের অনেক ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতেন।

অনেক সময় নিজের জন্য নতুন জামা না কিনে ছেলের বই কিনে দিতেন।

অনেক রাতে নিজের খাবার কমিয়ে ছেলের জন্য ভালো খাবার রেখে দিতেন।

রহিমা বেগম মাঝে মাঝে বলতেন,

— "তুমি নিজের শরীরের দিকে একটু খেয়াল রাখো। সবকিছু ছেলের জন্য করতে হবে না।"

করিম সাহেব হেসে বলতেন,

— "সন্তানের মুখে হাসি দেখার চেয়ে বড় সুখ একজন বাবার জীবনে আর কিছু নেই।"

সাদ যখন কলেজে ভর্তি হলো, তখন তার স্বপ্ন আরও বড় হয়ে গেল। সে শহরে গিয়ে পড়াশোনা করতে চাইল।

করিম সাহেব ছেলের ইচ্ছাকে সম্মান করলেন।

কিন্তু শহরের জীবন সাদের চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে বদলে দিতে লাগল।

নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু, নতুন সুযোগ—সবকিছু তাকে ব্যস্ত করে তুলল।

প্রথম দিকে সে নিয়মিত বাড়িতে ফোন করত।

মায়ের সঙ্গে গল্প করত, বাবার খোঁজ নিত।

কিন্তু কয়েক মাস পর সেই ফোনের সংখ্যা কমতে শুরু করল।

করিম সাহেব অপেক্ষা করতেন কখন ছেলে ফোন করবে।

অনেক রাতে তিনি মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকতেন।

কখনো ফোন না এলে নিজেই ফোন করতেন।

— "বাবা, কেমন আছিস?"

সাদ ব্যস্ত কণ্ঠে বলত,

— "ভালো আছি বাবা। এখন একটু ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।"

এই "পরে কথা বলব" কথাটা ধীরে ধীরে নিয়মিত হয়ে গেল।

একদিন করিম সাহেব বললেন,

— "বাবা, অনেক দিন তোকে দেখি না। সময় করে একবার বাড়িতে আয়। তোর মা প্রতিদিন তোর কথা বলে।"

সাদ উত্তর দিল,

— "বাবা, এখন আসা সম্ভব না। সামনে পরীক্ষা আর অনেক কাজ আছে। পরে আসব।"

করিম সাহেব কিছু বললেন না।

শুধু বললেন,

— "ঠিক আছে বাবা, নিজের যত্ন নিস।"

ফোন রাখার পর তিনি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

রহিমা বেগম বুঝতে পারলেন স্বামীর মন খারাপ।

তিনি বললেন,

— "ছেলে বড় হয়েছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত। মন খারাপ করো না।"

করিম সাহেব মৃদু হেসে বললেন,

— "আমি জানি। কিন্তু বাবা-মায়ের মন তো এমনই। সন্তান যত বড়ই হোক, তাদের কাছে সে সবসময় ছোটই থাকে।"

কয়েক বছর পর সাদ পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি পেল।

শহরে তার পরিচিতি বাড়তে লাগল।

সে ভালো বেতন পেত, সুন্দর জীবনযাপন করত।

কিন্তু ধীরে ধীরে সে ভুলে যেতে লাগল সেই ছোট্ট বাড়িটিকে, যেখানে তার জন্য দুটি মানুষ প্রতিদিন অপেক্ষা করত।

একসময় সাদ মনে করতে শুরু করল, তার এই অবস্থানে আসার পেছনে শুধু তার নিজের পরিশ্রম রয়েছে।

সে ভুলে গেল বাবার রাত জাগা পরিশ্রম, মায়ের ত্যাগ আর পরিবারের ভালোবাসা।

একদিন করিম সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

রহিমা বেগম ছেলেকে ফোন করে বললেন,

— "সাদ, তোর বাবার শরীর ভালো না। যদি পারিস একবার এসে দেখে যা।"

সাদ তখন অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ছিল।

সে বলল,

— "মা, এখন আসা সম্ভব না। ডাক্তার দেখাও। আমি সময় পেলে আসব।"

রহিমা বেগম কিছু বলতে পারলেন না।

চোখের পানি লুকিয়ে ফোন রেখে দিলেন।

করিম সাহেব পাশে শুয়ে ছিলেন।

তিনি সব শুনেছিলেন।

তিনি ধীরে ধীরে বললেন,

— "ছেলেকে কিছু বলো না। ওর নিজের জীবন আছে।"

রহিমা বেগম কষ্টের সঙ্গে বললেন,

— "কিন্তু বাবা, সন্তানের কাছে বাবা-মায়ের কি কোনো মূল্য নেই?"

করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— "মূল্য আছে। হয়তো এখন বুঝছে না। একদিন বুঝবে।"

কয়েকদিন পর করিম সাহেব কিছুটা সুস্থ হলেন।

কিন্তু তার শরীর আগের মতো থাকল না।

হাঁটতে কষ্ট হতো, সহজে ক্লান্ত হয়ে যেতেন।

তবুও তিনি প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

হয়তো ছেলে আসবে।

হয়তো বলবে,

"বাবা, আমি এসেছি।"

কিন্তু দিন চলে যায়, সপ্তাহ চলে যায়।

সাদ আসে না।

একদিন করিম সাহেব পুরোনো একটি ডায়েরি বের করলেন।

সেখানে তিনি ছেলের ছোটবেলার অনেক স্মৃতি লিখে রেখেছিলেন।

প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন, প্রথম পুরস্কার পাওয়ার দিন, প্রথমবার "বাবা" বলে ডাক—সবকিছু।

ডায়েরির শেষ পাতায় তিনি লিখলেন,

"সন্তান কখনো দূরে চলে যায় না, শুধু সময়ের ব্যস্ততায় তার পথ বদলে যায়। একজন বাবা শেষ দিন পর্যন্ত সন্তানের ভালোই চায়।"

কিন্তু করিম সাহেব জানতেন না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তখনও বাকি।

কারণ সামনে এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল, যা সাদের পুরো জীবন বদলে দেবে...

চলবে... (পার্ট–২)

গল্পের শিরোনাম: যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েও পাশে ছিল

পার্ট–২

করিম সাহেবের জীবনে সময় যেন ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছিল। শরীর আগের মতো শক্তি পাচ্ছিল না, কিন্তু মনের মধ্যে একটাই আশা ছিল—একদিন তার ছেলে সাদ বুঝবে, বাবা-মায়ের ভালোবাসার মূল্য কতটা।

অন্যদিকে সাদ শহরের ব্যস্ত জীবনে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে ব্যস্ত ছিল। ভালো চাকরি, নতুন গাড়ি, সুন্দর বাসা—সবকিছুই সে অর্জন করেছিল।

কিন্তু এত কিছুর মাঝেও তার জীবনে যেন একটা অদৃশ্য শূন্যতা ছিল।

কখনো কখনো রাতে একা বসে থাকলে তার মনে পড়ত ছোটবেলার কথা।

মনে পড়ত, বাবা তাকে কাঁধে করে মেলায় নিয়ে যেতেন।

মনে পড়ত, পরীক্ষার আগের রাতে বাবা তার পাশে বসে থাকতেন।

মনে পড়ত, অসুস্থ হলে বাবা সারারাত জেগে তার মাথায় পানি দিতেন।

কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ব্যস্ততা তাকে আবার সেই স্মৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিত।

সে নিজেকে বোঝাত,

"এখন আমার ক্যারিয়ার গড়ার সময়। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।"

কিন্তু জীবন সবসময় মানুষকে "পরে" সুযোগ দেয় না।

একদিন সকালে সাদের কাছে গ্রামের এক প্রতিবেশীর ফোন এলো।

— "সাদ, তুমি কি জানো তোমার বাবা আবার অসুস্থ হয়েছেন?"

সাদ কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,

— "কী হয়েছে?"

প্রতিবেশী বললেন,

— "শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছেন নিয়মিত দেখাশোনা দরকার।"

সাদের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।

সে বলল,

— "আমি কয়েক দিনের মধ্যে আসব।"

কিন্তু আগের মতোই কয়েক দিন পার হয়ে গেল।

কাজের চাপ, অফিসের সমস্যা, নানা অজুহাতে তার যাওয়া হলো না।

এক রাতে সাদ অফিস থেকে বাসায় ফিরছিল। হঠাৎ রাস্তায় একটি বৃদ্ধ মানুষকে দেখতে পেল। লোকটি রাস্তার পাশে বসে কাঁপছিলেন।

সাদের গাড়ি থেমে গেল।

কেন যেন তার মনে হলো, লোকটির কাছে যাওয়া উচিত।

সে গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করল,

— "চাচা, আপনার কী হয়েছে?"

বৃদ্ধ মানুষটি বললেন,

— "বাবা, শরীরটা ভালো না। একটু বসেছিলাম।"

সাদ তাকে পানি দিল, কাছের দোকান থেকে খাবার কিনে দিল।

বৃদ্ধ মানুষটি খাবার নিতে নিতে বললেন,

— "বাবা, আল্লাহ তোমার ভালো করুক। মানুষের কষ্ট বুঝতে পারা বড় বিষয়।"

এই কথাটা শুনে সাদের মনে বাবার কথা পড়ে গেল।

বাবাও তো সবসময় বলতেন,

"অন্যের কষ্ট দেখলে পাশে দাঁড়াবি।"

সেদিন রাতে সাদ অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

তার মনে হতে লাগল, সে কি সত্যিই ভালো মানুষ হতে পেরেছে?

যে বাবা তাকে মানুষের মতো মানুষ হতে শিখিয়েছেন, সেই বাবার পাশেই তো সে থাকতে পারেনি।

পরদিন সকালে সে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল—সে বাড়িতে যাবে।

অনেকদিন পর সাদ গ্রামের সেই পুরোনো বাড়ির সামনে দাঁড়াল।

বাড়িটা আগের মতোই আছে।

সেই বারান্দা, সেই গাছ, সেই দরজা।

কিন্তু সবকিছু যেন কেমন নিরব।

সে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই মা তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন।

— "সাদ! তুই এসেছিস?"

মায়ের কণ্ঠে আনন্দের সঙ্গে অভিমানও ছিল।

সাদ কিছু বলতে পারল না।

সে শুধু মায়ের পা ধরে কাঁদতে লাগল।

— "মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও।"

রহিমা বেগম ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

— "মায়ের কাছে সন্তানের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দরকার হয় না বাবা।"

সাদ বাবার ঘরে গেল।

দেখল, করিম সাহেব বিছানায় শুয়ে আছেন।

বাবা ছেলেকে দেখে মৃদু হাসলেন।

— "তুই এসেছিস বাবা?"

এই একটি কথাই সাদের হৃদয় ভেঙে দিল।

এতদিন পরও বাবার মুখে কোনো অভিযোগ নেই।

শুধু ভালোবাসা।

সাদ বাবার হাত ধরে বলল,

— "বাবা, আমি অনেক ভুল করেছি।"

করিম সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,

— "মানুষ ভুল করেই শেখে বাবা।"

সাদ চোখের পানি মুছে বলল,

— "তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে?"

করিম সাহেব হাসলেন।

— "বাবা কি কখনো সন্তানের ওপর রাগ জমিয়ে রাখে?"

সেদিন সাদ বুঝতে পারল, বাবা-মায়ের ভালোবাসা পৃথিবীর অন্য সব সম্পর্কের চেয়ে আলাদা।

সেই দিন থেকে সাদ নিজের জীবন বদলে ফেলল।

সে শহরের চাকরি ছেড়ে দেয়নি, কিন্তু নিজের জীবনের অগ্রাধিকার বদলে ফেলল।

প্রতিদিন বাবার সঙ্গে কথা বলত।

সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়িতে আসত।

বাবার চিকিৎসা, মায়ের প্রয়োজন—সবকিছু নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিতে শুরু করল।

করিম সাহেব ছেলের পরিবর্তন দেখে মনে মনে শান্তি পেলেন।

একদিন তিনি সাদকে বললেন,

— "বাবা, আমি কখনো চাইনি তুই শুধু আমার কাছে থাকিস। আমি চেয়েছি তুই ভালো থাকিস। কিন্তু ভালো থাকার মানে যেন কখনো নিজের মানুষদের ভুলে যাওয়া না হয়।"

সাদ বলল,

— "বাবা, এখন বুঝেছি। জীবনে অনেক কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু বাবা-মায়ের ভালোবাসা হারালে সেই শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না।"

সময় আবার এগিয়ে চলল।

করিম সাহেবের বয়স বাড়ছিল।

কিন্তু এখন তার জীবনে আর কোনো কষ্ট ছিল না।

কারণ তার ছেলে আবার ফিরে এসেছে।

একদিন সন্ধ্যায় করিম সাহেব পুরোনো ডায়েরিটি সাদের হাতে দিলেন।

বললেন,

— "এটা তোর জন্য রেখে দিয়েছিলাম।"

সাদ ডায়েরি খুলে দেখল, সেখানে তার পুরো শৈশবের গল্প লেখা।

প্রতিটি পাতায় বাবার ভালোবাসা।

প্রতিটি লাইনে বাবার স্বপ্ন।

ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল—

"আমার ছেলে একদিন বুঝবে, জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বই থেকে নয়, ভালোবাসা থেকে পাওয়া যায়।"

সাদ ডায়েরিটি বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

সে বুঝতে পারল, একজন বাবা কখনো সন্তানের কাছ থেকে সম্পদ চায় না।

সে শুধু চায়, তার সন্তান ভালো থাকুক।

কিন্তু করিম সাহেবের জীবনের গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

কারণ শেষ মুহূর্তে তিনি সাদকে এমন একটি শিক্ষা দিয়ে যাবেন, যা শুধু তার ছেলে নয়, পুরো সমাজের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

চলবে... (পার্ট–৩)

====

গল্পের শিরোনাম: যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েও পাশে ছিল

পার্ট–৩

করিম সাহেবের জীবনের শেষ সময়গুলো এখন অনেক শান্তিতে কাটছিল। যে মানুষটি একসময় ছেলের অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকতেন, এখন সেই ছেলে প্রতিদিন তার পাশে বসে গল্প করে।

জীবনের অনেক কষ্ট, অনেক অভিমান যেন ভালোবাসার কাছে হার মেনে গেছে।

সাদ এখন বুঝতে পেরেছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলোকে অবহেলা করলে একদিন নিজের কাছেই হার মানতে হয়।

একদিন সকালে করিম সাহেব বারান্দায় বসে ছিলেন। সাদ বাবার পাশে বসে চা খাচ্ছিল।

হঠাৎ করিম সাহেব বললেন,

— "বাবা, জানিস? ছোটবেলায় তোকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল।"

সাদ মৃদু হেসে বলল,

— "আমি জানি বাবা। তুমি চেয়েছিলে আমি বড় মানুষ হই।"

করিম সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,

— "না বাবা, আমি চেয়েছিলাম তুই ভালো মানুষ হ। বড় চাকরি, বড় বাড়ি—এসব জীবনের ছোট অংশ। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই আসল সফলতা।"

সাদের চোখ ভিজে গেল।

সে বলল,

— "বাবা, তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করতে, তাহলে হয়তো আমি কখনো নিজেকে খুঁজে পেতাম না।"

করিম সাহেব হেসে বললেন,

— "বাবা-মায়ের ভালোবাসায় ক্ষমা থাকে, হিসাব থাকে না।"

এই কথাটি সাদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেল।

এরপর থেকে সাদ শুধু নিজের বাবা-মায়ের জন্য নয়, সমাজের অসহায় মানুষের জন্যও কাজ করতে শুরু করল।

সে লক্ষ্য করল, তার আশেপাশে অনেক বৃদ্ধ মানুষ আছেন, যাদের সন্তান আছে, কিন্তু পাশে কেউ নেই।

কেউ বৃদ্ধাশ্রমে পড়ে আছেন, কেউ একা ঘরে দিন কাটাচ্ছেন।

সাদের মনে হলো, এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করা দরকার।

সে বাবার নামে একটি ছোট মানবসেবা কেন্দ্র চালু করল।

সেখানে অসহায় বৃদ্ধদের চিকিৎসা, খাবার এবং থাকার ব্যবস্থা করা হতো।

প্রথম দিকে অনেকেই অবাক হয়েছিল।

একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,

— "আপনি এত কিছু করছেন কেন?"

সাদ উত্তর দিয়েছিল,

— "কারণ আমি একজন বাবার ভালোবাসার ঋণ শোধ করার চেষ্টা করছি।"

কিছুদিন পর সেই মানবসেবা কেন্দ্রে একজন বৃদ্ধ মানুষ এলেন।

তার নাম ছিল হাবিব সাহেব।

তিনি অনেক বছর আগে নিজের সন্তানদের জন্য সবকিছু করেছিলেন। কিন্তু বয়স হওয়ার পর সন্তানরা তাকে আর নিজের কাছে রাখতে চায়নি।

হাবিব সাহেব একদিন সাদকে বললেন,

— "বাবা, তুমি জানো? জীবনে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ক্ষুধা নয়, একাকীত্ব।"

সাদ চুপ করে শুনছিল।

বৃদ্ধ আবার বললেন,

— "একজন মানুষ তখনই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়, যখন তার আপন মানুষগুলো তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে মনে করে।"

এই কথা শুনে সাদের মনে বাবার কথা মনে পড়ল।

সে বুঝতে পারল, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যারা শুধু একটু ভালোবাসা আর সম্মানের অপেক্ষায় থাকে।

সে হাবিব সাহেবের হাত ধরে বলল,

— "চাচা, এখন থেকে আপনি একা নন।"

বৃদ্ধের চোখে পানি চলে এলো।

তিনি বললেন,

— "বাবা, রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করা যায়।"

সময় চলে যেতে লাগল।

করিম সাহেব ধীরে ধীরে আরও দুর্বল হয়ে পড়লেন।

এক রাতে তিনি সাদকে কাছে ডাকলেন।

ঘরে তখন নীরবতা।

বাইরে হালকা বাতাস বইছে।

করিম সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,

— "বাবা, মনে হচ্ছে আমার সময় শেষের দিকে।"

সাদ কেঁদে বলল,

— "এমন কথা বলো না বাবা। তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।"

করিম সাহেব মৃদু হাসলেন।

— "মানুষের পৃথিবীতে আসা আর যাওয়ার সময় নির্ধারিত। কিন্তু আমি শান্তিতে আছি। কারণ আমার ছেলে এখন বুঝেছে জীবনের আসল মূল্য।"

তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,

— "আমার একটা অনুরোধ রাখবি?"

সাদ চোখের পানি মুছে বলল,

— "বলো বাবা।"

— "কখনো কোনো বৃদ্ধ মানুষকে অবহেলা করিস না। কারণ বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় ভালোবাসা আর সম্মানের।"

সাদ বাবার হাত ধরে বলল,

— "আমি কথা দিচ্ছি বাবা।"

করিম সাহেব শেষবারের মতো ছেলের দিকে তাকালেন।

তার চোখে ছিল তৃপ্তি।

কারণ একজন বাবা হিসেবে তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

তিনি তার সন্তানকে শুধু সফল নয়, একজন মানবিক মানুষ হিসেবে দেখতে পেয়েছেন।

কয়েকদিন পর করিম সাহেব পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

সেদিন পুরো গ্রামে শোক নেমে এলো।

কারণ তিনি শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, সবার জন্য একজন ভালো মানুষ ছিলেন।

সাদ বাবার পুরোনো ঘরে গিয়ে সেই ডায়েরিটি আবার খুলল।

শেষ পাতায় বাবার লেখা কয়েকটি লাইন ছিল—

"আমার প্রিয় ছেলে,

যদি কখনো আমি তোর পাশে না থাকি, মনে করবি আমার শিক্ষা তোর সঙ্গে আছে।

মানুষের পাশে দাঁড়াস।

কারো চোখের পানি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করিস।

কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—তুই কত বড় মানুষ হয়েছিস তা নয়, তুই কত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিস।"

সাদ ডায়েরিটি বুকে জড়িয়ে ধরল।

তার মনে হলো, বাবা হারিয়ে যাননি।

তিনি তার কাজের মধ্যে, তার শিক্ষার মধ্যে, তার ভালোবাসার মধ্যে আজও বেঁচে আছেন।

বছরের পর বছর কেটে গেল।

সাদের মানবসেবা কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল।

হাজারো মানুষ সেখানে সাহায্য পেতে লাগল।

একদিন এক ছোট ছেলে সাদকে জিজ্ঞেস করল,

— "চাচা, আপনি এত ভালো কাজ করেন কেন?"

সাদ কিছুক্ষণ চুপ করে আকাশের দিকে তাকাল।

তারপর বলল,

— "কারণ একজন মানুষ আমাকে শিখিয়েছিলেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ভালোবাসা। সেই মানুষটি আজ আমার পাশে নেই, কিন্তু তার শিক্ষা আজও আমার পথ দেখায়।"

ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,

— "তিনি কে ছিলেন?"

সাদ মৃদু হেসে বলল,

— "তিনি ছিলেন আমার বাবা।"


শিক্ষণীয় বিষয়:

জীবনে সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে কখনো সেই মানুষগুলোকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়, যারা আমাদের পথ চলার শক্তি দিয়েছেন। বাবা-মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ এবং দোয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

সময় থাকতে প্রিয় মানুষদের মূল্য দিতে শিখুন। কারণ হারিয়ে যাওয়ার পর ভালোবাসা প্রকাশ করার সুযোগ অনেক সময় আর ফিরে আসে না।

শেষ।

 

 আরও পড়ুনঃ 

যে মানুষটি নিজের নাম রেখে যায়নি

যৌন শক্তি বৃদ্ধির উপায় | যৌন দুর্বলতা দূর করার প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধান

মেয়েদের সাদা স্রাবের সমস্যা: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

শেষ চিঠি | আবেগঘন বাংলা গল্প | মা ও সন্তানের ভালোবাসা

বিশ্বাসী সেই মেয়ে 

 

 

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url